অনামিকা - কাজী নজরুল ইসলাম | যৌবনের প্রেমের কবিতা Skip to main content

অনামিকা - কাজী নজরুল ইসলাম | যৌবনের প্রেমের কবিতা

onamika-kazi-nazrul-islam-jouboner-premer-kobita

তোমারে বন্দনা করি 

স্বপ্ন-সহচরী 

লো আমার অনাগত প্রিয়া, 

আমার পাওয়ার বুকে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া! 

তোমারে বন্দনা করি…. 

হে আমার মানস-রঙ্গিণী, 

অনন্ত-যৌবনা বালা, চিরন্তন বাসনা-সঙ্গিনী! 

তোমারে বন্দনা করি…. 

নাম-নাহি-জানা ওগো আজো-নাহি-আসা! 

আমার বন্দনা লহ, লহ ভালবাসা…. 

গোপণ-চারিণী মোর, লো চির-প্রেয়সী! 

সৃষ্টি-দিন হ’তে কাঁদ’ বাসনার অন্তরালে বসি’- 

ধরা নাহি দিলে দেহে। 


 তোমার কল্যাণ-দীপ জ্বলিলে না 

দীপ-নেভা বেড়া-দেওয়া গেহে। 

অসীমা! এলে না তুমি সীমারেখা-পারে! 

স্বপনে পাইয়া তোমা’ স্বপনে হারাই বারে বারে 

অরুপা লো! রহি হ’য়ে এলে মনে, 

সতী হ’য়ে এলে না ক’ ঘরে। 

প্রিয় হ’য়ে এলে প্রেমে, 

বধূ হয়ে এলে না অধরে! 

দ্রাক্ষা-বুকে রহিলে গোপনে তুমি শিরীন্‌ শরাব, 

পেয়ালায় নাহি এলে!- 

‘উতারো নেকার’- 

হাঁকে মোর দুরন্ত কামনা! 

সুদুরিকা! দূরে থাক’-ভালোবাসা-নিকটে এসো না। 


তুমি নহ নিভে যাওয়া আলো, নহ শিখা। 

তুমি মরীচিকা, 

তুমি জ্যোতি।- 

জন্ম-জন্মান্তর ধরি’ লোকে-লোকান্তরে তোমা’ করেছি আরতি, 

বারে বারে একই জন্মে শতবার করি! 

যেখানে দেখেছি রূপ,-করেছি বন্দনা প্রিয়া তোমারেই স্মরি’। 

রূপে রূপে, অপরূপা, খুঁজেছি তোমায়, 

পবনের যবনিকা যত তুলি তত বেড়ে যায়! 

বিরহের কান্না-ধোওয়া তৃপ্ত হিয়া ভরি’ 

বারে বারে উদিয়াছ ইন্দ্রধনুসমা, 

হাওয়া-পরী 

প্রিয় মনোরমা! 

ধরিতে গিয়োছি-তুমি মিলায়েছ দূর দিগ্বলয়ে 

ব্যথা-দেওয়া রাণী মোর, এলে না ক’ কথা কওয়া হ’য়ে। 


চির-দূরে থাকা ওগো চির-নাহি-আসা! 

তোমারে দেহের তীরে পাবার দুরাশা 

গ্রহ হ’তে গ্রহান্তরে ল’য়ে যায় মোরে! 

বাসনার বিপুল আগ্রহে- 

জন্ম লভি লোকে-লোকান্তরে! 

উদ্বেলিত বুকে মোর অতৃপ্ত যৌবন-ক্ষুধা 

উদগ্র কামনা, 

জন্ম তাই লভি বারে বারে, 

না-পাওয়ার করি আরাধনা!…. 

যা-কিছু সুন্দর হেরি’ ক’রেছি চুম্বন, 

যা-কিছু চুম্বন দিয়া ক’রেছি সুন্দর- 

সে-সবার মাঝে যেন তব হরষণ 

অনুভব করিয়াছি!-ছুঁয়েছি অধর 

তিলোত্তমা, তিলে তিলে! 

তোমারে যে করেছি চুম্বন 

প্রতি তরুণীর ঠোঁটে 

প্রকাশ গোপন। 


যে কেহ প্রিয়ারে তার চুম্বিয়াছে ঘুম-ভাঙা রাতে, 

রাত্রি-জাগা তন্দ্রা-লাগা ঘুম-পাওয়া প্রাতে, 

সকলের সাথে আমি চুমিয়াছি তোমা’ 

সকলের ঠোঁটে যেন, হে নিখিল-প্রিয়া প্রিয়তমা! 

তরু, লতা, পশু, পাখী, সকলের কামনার সাথে 

আমার কামনা জাগে,-আমি রমি বিশ্ব-কামনাতে! 

বঞ্চিত যাহারা প্রেমে, ভুঞ্জে যারা রতি- 

সকলের মাঝে আমি-সকলের প্রেমে মোর গতি! 

যে-দিন স্রষ্টার বুকে জেগেছিল আদি সৃষ্টি-কাম, 

সেই দিন স্রষ্টা সাথে তুমি এলে, আমি আসিলাম। 

আমি কাম, তুমি হ’লে রতি, 

তরুণ-তরুণী বুকে নিত্য তাই আমাদের অপরূপ গতি! 

কী যে তুমি, কী যে নহ, কত ভাবি-কত দিকে চাই! 

নামে নামে, অ-নামিকা, তোমারে কি খুঁজিনু বৃথাই? 

বৃথাই বাসিনু ভালো? বৃথা সবে ভালোবাসে মোরে? 

তুমি ভেবে যারে বুকে চেপে ধরি সে-ই যায় স’রে। 

কেন হেন হয়, হায়, কেন লয় মনে- 

যারে ভালো বাসিলাম, তারো চেয়ে ভালো কেহ 

বাসিছে গোপনে। 


সে বুঝি সুন্দরতর-আরো আরো মধু! 

আমারি বধূর বুকে হাসো তুমি হ’য়ে নববধূ। 

বুকে যারে পাই, হায়, 

তারি বুকে তাহারি শয্যায় 

নাহি-পাওয়া হ’য়ে তুমি কাঁদ একাকিনী, 

ওগো মোর প্রিয়ার সতিনী।…. 

বারে বারে পাইলাম-বারে বারে মন যেন কহে- 

নহে, এ সে নহে! 

কুহেলিকা! কোথা তুমি? দেখা পাব কবে? 

জন্মেছিলে জন্মিয়াছ কিম্বা জন্ম লবে? 

কথা কও, কও কথা প্রিয়া, 

হে আমার যুগে-যুগে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া! 


কহিবে না কথা তুমি! আজ মনে হয়, 

প্রেম সত্য চিরন্তন, প্রেমের পাত্র সে বুঝি চিরন্তন নয়। 

জন্ম যার কামনার বীজে 

কামনারই মাঝে সে যে বেড়ে যায় কল্পতরু নিজে। 

দিকে দিকে শাখা তার করে অভিযান, 

ও যেন শুষিয়া নেবে আকাশের যত বায়ু প্রাণ। 

আকাশ ঢেকেছে তার পাখা 

কামনার সবুজ বলাকা! 


প্রেম সত্য, প্রেম-পাত্র বহু-আগণন, 

তাই-চাই, বুকে পাই, তবু কেন কেঁদে ওঠে মন। 

মদ সত্য, পাত্র সত্য নয়! 

যে-পাত্রে ঢালিয়া খাও সেই নেশা হয়! 

চির-সহচরী! 

এতদিনে পরিচয় পেনু, মরি মরি! 

আমারি প্রেমের মাঝে রয়েছ গোপন, 

বৃথা আমি খুঁজে মরি’ জন্মে জন্মে করিনু রোদন। 

প্রতি রূপে, অপরূপা, ডাক তুমি, 

চিনেছি তোমায়, 

যাহারে বাসিব ভালো-সে-ই তুমি, 

ধরা দেবে তায়! 

প্রেম এক, প্রেমিকা সে বহু, 

বহু পাত্রে ঢেলে পি’ব সেই প্রেম- 

সে শরাব লোহু। 

তোমারে করিব পান, অ-নামিকা, শত কামনায়, 

ভৃঙ্গারে, গোলাসে কভু, কভু পেয়ালায়!



কবিতাটি ভালো লাগলে শেয়ার করে দেন

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

সকল বেলা কাটিয়া গেল বিকাল নাহি যায়। দিনের শেষে শ্রান্তছবি কিছুতে যেতে চায় না রবি, চাহিয়া থাকে ধরণী-পানে, বিদায় নাহি চায়। মেঘেতে দিন জড়ায়ে থাকে, মিলায়ে থাকে মাঠে— পড়িয়া থাকে তরুর শিরে, কাঁপিতে থাকে নদীর নীরে, দাঁড়ায়ে থেকে দীর্ঘ ছায়া মেলিয়া ঘাটে বাটে। এখনো ঘুঘু ডাকিছে ডালে করুণ একতানে। অলস দুখে দীর্ঘ দিন ছিল সে বসে মিলনহীন, এখনো তার বিরহগাথা বিরাম নাহি মানে। বধূরা দেখো আইল ঘাটে, এল না ছায়া তবু। কলস-ঘায়ে ঊর্মি টুটে, রশ্মিরাশি চূর্ণি উঠে, শ্রান্ত বায়ু প্রান্তনীর চুম্বি যায় কভু। দিবসশেষে বাহিরে এসে সেও কি এতখনে নীলাম্বরে অঙ্গ ঘিরে নেমেছে সেই নিভৃত নীরে, প্রাচীরে-ঘেরা ছায়াতে-ঢাকা বিজন ফুলবনে? স্নিগ্ধ জল মুগ্ধভাবে ধরেছে তনুখানি। মধুর দুটি বাহুর ঘায় অগাধ জল টুটিয়া যায়, গ্রীবার কাছে নাচিয়া উঠি করিছে কানাকানি। কপোলে তার কিরণ প’ড়ে তুলেছে রাঙা করি। মুখের ছায়া পড়িয়া জলে নিজেরে যেন খুঁজিছে ছলে, জলের’পরে ছড়ায়ে পড়ে আঁচল খসি পড়ি। জলের’পরে এলায়ে দিয়ে আপন রূপখানি শরমহীন আরামসুখে হাসিটি ভাসে মধুর মুখে, বনের ছায়া ধরার চোখে দিয়েছে পাতা টানি। সলিলতলে সোপান-’পরে উদাস বেশবাস

কাশফুলের কাব্য - নির্মলেন্দু গুণ | কাশফুল নিয়ে প্রেমের কবিতা

ভেবেছিলাম প্রথম যেদিন ফুটবে তোমায় দেখব, তোমার পুষ্প বনের গাঁথা মনের মতো লেখব। তখন কালো কাজল মেঘ তো ব্যস্ত ছিল ছুটতে, ভেবেছিলাম আরো ক’দিন যাবে তোমার ফুটতে। সবে তো এই বর্ষা গেল শরৎ এলো মাত্র,  এরই মধ্যে শুভ্র কাশে ভরলো তোমার গাত্র। ক্ষেতের আলে, নদীর কূলে পুকুরের ঐ পাড়টায়। হঠাৎ দেখি কাশ ফুটেছে বাঁশবনের ঐ ধারটায়! আকাশ থেকে মুখ নামিয়ে মাটির দিকে নুয়ে,  দেখি ভোরের বাতাসে কাশ দুলছে মাটি ছুঁয়ে। কিন্তু কখন ফুটেছে তা  কেউ পারে না বলতে, সবাই শুধু থমকে দাঁড়ায় গাঁয়ের পথে চলতে। পুচ্ছ তোলা পাখির মতো কাশবনে এক কন্যে, তুলছে কাশের ময়ূর চূড়া কালো খোঁপার জন্যে। যেন শরত রাণী কাশের বোরখাখানি খুলে, কাশবনের ঐ আড়াল থেকে নাচছে দুলে দুলে। প্রথম কবে ফুটেছে কাশ সেই শুধু তা জানে, তাই তো সে তা সবার আগে খোঁপায় বেঁধে আনে। ইচ্ছে করে ডেকে বলিঃ ‘ওগো কাশের মেয়ে, আজকে আমার চোখ জুড়ালো তোমার দেখা পেয়ে।’ ‘তোমার হাতে বন্দী আমার ভালোবাসার কাশ, তাই তো আমি এই শরতে তোমার ক্রতদাস।’ ভালোবাসার কাব্য শুনে কাশ ঝরেছে যাই,  দেখি আমার শরত-রাণী কাশবনে আর নেই। কবিতাটি ভালো লাগলে শেয়ার করবেন

কৃষ্ণকলি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | কালো মেয়ে নিয়ে কবিতা

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক। মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ‐চোখ। ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে, মুক্তবেণী পিঠের’পরে লোটে। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ‐চোখ। ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই। শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই। আকাশ‐পানে হানি যুগল ভুরু শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ‐চোখ। পূবে বাতাস এল হঠাৎ ধেয়ে, ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ। আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা, মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ। আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে, আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ‐চোখ। এমনি করে কাজল কালো মেঘ জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈশান কোণে। এমনি করে কালো কোমল ছায়া আষাঢ়মাসে নামে তমাল‐বনে। এমনি করে শ্রাবণ‐রজনীতে হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ‐চোখ। কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, আর যা বলে বলুক অন্য লোক। দেখেছিলেম ময়না পাড়ার মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ‐চোখ। মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস, লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ। ক